সোনারগাঁও দর্পণ :
সোনারগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী ও একমাত্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় যেন দুর্নীতির আঁতুর ঘরে পরিণত হয়েছে। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর “সোনারগাঁও দর্পণ” এর অনলাইন পোর্টাল এবং ফেসবুক পেজে ‘শিক্ষা মানোন্নয়ন নয়, নিজের উন্নয়নে ব্যস্ত প্রধান শিক্ষক’ শিরোনামে ভার্চূয়ালসহ প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার করা হয়।
প্রতিবেদনটি প্রচার ও প্রকাশের পর কিছুদিন দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্টরা দুর্নীতি থেকে বিরত থাকলেও আবারও পূর্বের চেয়ে অধিক হারে দুর্নীতি গ্রস্থ হয়ে পরেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করে।
নাম প্রকাশে একাধিক অভিভাবক জানায়, সরকারি হিসেবে প্রতি মাসে বেতন বাবদ ১২টা সরকারি ফি নির্ধারণ থাকলেও প্রতি তিন মাস অন্তর শিক্ষার্থী প্রতি আদায় করা হচ্ছে ৭৫০ টাকা। এছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময় অভিভাবকদের নানা খাত দেখিয়ে আদায় করা হয় অতিরিক্ত অর্থ।
অভিভাবকরা জানান, ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিসিএস শিক্ষা প্রশাসনের মো: শাহ আলম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে নিজেকে সর্বেসর্বা'র আসনে বসিয়ে সরকারি নিয়ম- নীতির তোয়াক্কা না করে এ সকল অনৈতিক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছেন। ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে ১৭শ শিক্ষার্থীর কাছ থেকেই আদায় করছেন এ বাড়তি ফি।
যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক বাড়তি টাকা আদায়ের কারণ হিসেবে শিক্ষক কম থাকার কথা জানিয়ে বেশি টাকা নেওয়ার কথা স্বীকারও করেছেন। তবে অভিভাবকদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটিতে ১৭শ শিক্ষার্থী থাকলেও প্রধান শিক্ষক মাত্র ১৩/১৪ জন অভিভাবকের সাথে কথা বলে তাদের স্বাক্ষর নিয়ে খন্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ এবং তাদের খরচের জন্য অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয় জানান। পরবর্তীতে উপস্থিত অভিভাবকদের মধ্যে মাত্র ৪জন অভিভাবকের সম্মতিসূচক স্বাক্ষর নিয়ে পুরোপুরি অনৈতিকভাবে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুরো সতেরশ অভিভাবকের ঘাড়ে চাঁপিয়ে দেন।
অভিযোগ রয়েছে, খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের মধ্যে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ হয়েছে বেশিরভাগ শিক্ষকের। যাদের নেওয়া হয়েছে তাদের কোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটিতে চাকুরি করেন এমন শিক্ষকদের স্ত্রী, মেয়ে, ছেলের বউসহ নিকট আত্মীয়দের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, টিফিন বাবদ প্রতি মাসে ১০০ টাকা নেওয়া হলেও প্রতিদিন টিফিন সরবরাহ করা হয় না। আর টিফিন বাবদ যে সকল খাবার পরিবেশন করা হয় তা খুবই নিন্ম মানের ও অস্বাস্থ্যকর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক ও শিক্ষার্থী জানায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির দফতরি কাম অফিস সহায়ক জামান মিয়া প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষকের সহায়তায় কক্ষ দখল করে টিফিন বিক্রির নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। যেখানে শিক্ষার্থীদের কাছে অস্বাস্থ্যকর তেলে ভাজা জাতীয় খাবারের পাশাপাশি নিন্মমানের বেকারি পণ্য বিক্রি করেন। এমনকি শিক্ষার্থীদের যে টিফিন দেওয়া হয়, সে টিফিনও জামানের কাছ থেকে ক্রয় করা হয়। যে লাভ হয় সে লাভের একটা অংশ দেওয়া স্কুলের দুর্নীতির সহায়ক প্রধান শিক্ষক, সহকারি শিক্ষক সুধাংসু সিন্ডিকেটকে। জামানের ব্যবসা চালানোর ব্যবহৃত বিদ্যুৎ বিলও দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠান থেকে।
এছাড়াও কম্পিউটার ল্যাব ফি বাবদ শিক্ষার্থী প্রতি ১৫০ টাকা আদায় করা হলেও নিয়মিত কম্পিউটার ক্লাস করানো হয়না। অপরদিকে, ম্যাগাজিন ফি, উন্নয়ন ফিসহ বিভিন্ন খাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন অভিভাবকরা।
তবে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন শিক্ষকদের বেতন পরিশোধের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় কতটা বৈধ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা। তাদের দাবি, স্থানীয়ভাবে যাদের এ সকল বিষয় তদারকি করার কথা তারা অজ্ঞাত কারণে সঠিক তদন্ত থেকে পিছিয়ে থাকেন। সম্ভবত সর্ষের মধ্যেই ভূত লুকিয়ে আছে। তাই তারা বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ আলম বলেন, “শিক্ষক সংকটের কারণে বেশ কয়েকজন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হয়েছে। আমি আসার পরও তিন জনকে নিয়োগ দিয়েছি। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয় সে টাকা খন্ডকালীন শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হয় বলে দাবি করেন।
তিনি বলেন, যদি অভিভাবকরা মনে করেন খন্ডকালীন শিক্ষক প্রয়োজন নাই তাহলে খন্ডকালীন শিক্ষকদের যে একশত টাকা নেওয়া হয় সেই টাকা নেওয়া হবেনা। আর এ স্কুলে ঠিক মতো পাঠ দান করাতে ৪৫ জন শিক্ষক প্রয়োজন, যেখানে আছে মাত্র ৯ জন। সে ক্ষেত্রে স্কুলের লেখাপড়া না হলে আমার কোন দায় থাকবেনা।
তবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দাবি, খন্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের কথা বলে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ সরকারি বিধি মোতাবেক অবৈধ। প্রধান শিক্ষক এমনটা করতে পারেন না। যদি করে থাকেন, তাহলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Post a Comment