সোনারগাঁও দর্পণ :
নদী খনন (ড্রেজিং) এর নামে রাতভর অবৈধভাবে বালু কেটে নিয়ে যাচ্ছে বালু খেকো চোরের দল। সূর্য ডোবার পর থেকেই নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের মেঘনা নদীতে শুরু হয় বালু খেকোদের দৌরাত্ব। আর এ কাজে স্থানীয় একাধিক কথিত সাংবাদিক ও রাজনীতিকদের সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেট ও প্রশাসনের পরোক্ষ সহযোগিতা রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
গত ১০ মে শুরু হওয়া অবৈধ এ কাজে শুধু ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মালিক সকল খরচ বাদে ৭ দিনে ৩৮ লাখ ৪৬ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ঠিকাদার সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ^স্ত সূত্র দাবি করেছে।
সূত্রের দেয়া তথ্য মতে, গত ১১দিন ধরে অবৈধ বালু চুরির সাথে মোট ১৫ থেকে ২০ টি ড্রেজার দিয়ে রাতের আঁধারে উপজেলার আনন্দ বাজার গরুর হাটের অদূরে মেঘনার মোহনা থেকে বালু উত্তোলন করছে একদল বালু চোর। আর এ কাজে সহায়তা করছে সুবিধাবাদি নেতা নেতা হিসাবে ব্যাপক পরিচিত, উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান প্রার্থী ও বর্তমান এমপির আস্থাভাজন মাসুম রানা, মেঘনা উপজেলার চালিভাঙ্গা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুল বারেক এবং নলচর গ্রামের হাবিবুল্লাহর ছেলে রবিউল্লাহ রবিসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। এছাড়া, স্থানীয় একাধিক কথিত সাংবাদিকও জড়িত। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা অজ্ঞাত কারণে চোখে কাঁঠের চশমা আর নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছেন।
যদিও অবৈধভাবে এ বালু উত্তোলনের ফলে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, একাধিক শিল্প কারখানা, পাঁচটি গ্রামের মানুষ এবং একটি বাজারে থাকা ব্যবসায়ীদের চোখের ঘুম ইতোমধ্যে হারাম হয়ে গেছে। আগামী বর্ষায় ভাঙ্গনের কবলে এ সকল স্থাপনা আর গ্রামগুলো বিলিন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
এদিকে, রাতের আধাঁরে বালু চুরির ঘটনা (ছবি ও ভিডিও) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হলে স্থানীয় নেটিজনদের বিভিন্ন মন্তব্য করতে দেখা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, চোরাই বালু উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত ড্রেজারের মধ্যে স্থানীয় সাংবাদিকদের নামেও দুটি ড্রেজার বালু উত্তোলন করছে। তার মধ্যে দেশের প্রথম সারির অন্যতম দুটি পত্রিকার দুই সাংবাদিকের নামে একটি এবং অপর একটি পত্রিকার সাংবাদিকের নামে আরও একটি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে ড্রেজার বসানো কথিত সাংবাদিকদের মাধ্যমে রাখা হয়েছে সাংবাদিক নামধারী আরও কিছু দালাল।
নাম প্রকাশে অন্য একটি সূত্র দাবি করে, উপজেলা বিএনপির অন্যতম শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতা এ বালু উত্তোলনের সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত থাকায় প্রশাসন এবং রাজনৈতিকভাবে কোন প্রতিকারের চেষ্টাও কেউ করছেনা।
তবে, দিনের বেলায় একটি ১২ ইঞ্চি কাটিং ড্রেজার দিয়ে নদী খননের কাজ করতে দেখা গেছে বলে একটি সূত্র জানায়।
যদিও সোনারগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাতের দাবি, ‘বিআইডব্লিউটিএ’র অনুমতি সাপেক্ষে নদী খননের কাজ চলছে। আর বালু উত্তোলনের বিষয়টি তার জানা নেই। তিনি আরও বলেন, রাতে বালু কাটার কোন আইন নেই। এছাড়া, উপজেলা প্রশাসনের পর্যাপ্ত লোকবলসহ কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
তবে, ‘বিআইডব্লিউটিএ’ যদি উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চায় এবং পর্যাপ্ত লোকবল দেয় সে ক্ষেত্রে তিনি অভিযান পরিচালনা করতে পারবেন বলে জানান।
স্থানীয় সূত্রে জানাগেছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে মুন্সীগঞ্জের চাকদা ড্রেজিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (প্রাইভেট) লিমিটেড মেঘনা নদী খননের অনুমতি পায়। দরপত্র অনুযায়ী দেশের প্রচলিত নিয়ম-নীতি মেনে আনন্দবাজার হাট থেকে বারদি পর্যন্ত সাড়ে ৪ কিলোমিটার নদী ১৮ ইঞ্চি কাটিং ড্রেজার দিয়ে খনন করে উত্তোলিত বালু নদী পাড়ে ডাম্পিং এর পর নিয়মিত বিরতিতে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করার কথা। কিন্তু বাস্তবে প্রচলিত নিয়ম রীতির তোয়াক্কা না করে সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত রাতভর লোডিং ড্রেজার দিয়ে দরপত্র অনুযায়ী নদী খনন না করে প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষ তার ইচ্ছা মতো বেশ কিছু ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে এ বালু উত্তোলন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
পিরোজপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান প্রার্থী মাসুম রানাকে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নাঈমা ইসলামের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, জেলা প্রশাসন থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ। সম্প্রতি কাউকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে আমার জানামতে, বিআইডব্লিউটিএ এর একটি প্রকল্পের কাজ সোনারগাঁও উপজেলায় চলমান বলে আমি শুনেছি। এ ব্যাপারে তারাই (বিআইডব্লিউটিএ) ভালো বলতে পারবে।
বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ এর তত্ত্বাবধায়ক (ড্রেজিং) আব্দুর রহমান বলেন, প্রথমতো বালু উত্তোলনের কোন অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার বিআইডব্লিউটিএ এর নেই। দ্বিতীয়ত, রাতের বেলা ড্রেজিংয়ের অনুমতিও নেই। তৃতীয়ত, আমাদের কাজ (ড্রেজিং) করতে হলে ১৮ ইঞ্চি কাটিং ড্রেজার দিয়ে দিনের বেলা করতে হয়। এর বাইরে কোন কাজ করা বা বালু উত্তোলনের অনুমতি আছে বলে আমার জানা নেই।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে ঠিকাদার মোমেন সিকদার (১৯ মে) বলেন, ড্রেজিংতো বালু উত্তোলনের আওতায়ই। তবে, ডিসি অফিস থেকে যেভাবে চর কাটার অনুমতি দেওয়া হয় সে রকম না। কোন বালু বিক্রি করিনা আমি। কোন বালু উত্তোলনও করিনা। মাত্র আমার একটা ড্রেজার স্পটে আসছে, ফিটিং হয় নাই এখন পর্যন্ত।
যারা বালু কাটার দায়িত্বে আছে তারা আপনার কথা বলছে এবং আপনার নাম্বারটা তাদের কাছ থেকেই পেলাম। এমন প্রশ্নের জবাবে মোমেন শিকদারের ফিরতি প্রশ্ন কই আছে ড্রেজার ? কোথায় কাটতেছে ?
যে ড্রেজার আসছে সেইটাতে সুন্দর করে ব্যানার টাঙ্গানো আছে, যেখানে লিখা ‘বিআইডব্লিউটিএ’ এর অনুমোদিত বালু খনন প্রকল্প। অকপটে আরেকটি ড্রেজার দিয়ে বালু পরতেছে স্বীকার করে পরক্ষণেই সেই ড্রেজারও তার নয় বলে দাবি করেন মোমিন শিকদার। ওই ড্রেজারটি দায়েন বা ডালিম নামে একজনের বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি জানান, তিনি বারদী থেকে বৈদ্দেরবাজার পর্যন্ত সাড়ে ৪ কিলোমিটার নদী ড্রেজিংয়ের কাজ পান বিআইডব্লিউটিএ’ এর কাছ থেকে। কাজ পাওয়ার অনুমতির কাগজ চাইলে তিনি এক কথিত সাংবাদিককে ফোন ধরিয়ে তার সাথে কথা বলতে বলেন। ফোনের ওপাশ থেকে কথা বলতে আসার ব্যক্তি প্রতিবেদকের নাম জানতে চাইলে নাম বলার পরই ফোনটি পূণরায় মোমেন শিকদারের কাছে ফেরত দেন। পরে তিনি প্রতিবেদককে তার কলাপাতা রেস্টুরেন্টের অফিসে যাওয়ার কথা বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

Post a Comment