এরা ভয়ঙ্কর, এরা ছিনতাইকারী,; এদের কর্মকান্ড অঙ্কুরে বিনাশ করুন

মোকাররম মামুন, সোনারগাঁও দর্পণ :  

পান-সিগারেটের দোকান। দুটি শিশু (একজনের বয়স ৮ কি ৯ বছর, অপরজনের ১২ কি ১৩) এসে পান চায় দোকানীর কাছে। শিশুর পান চাওয়ার ধরণ আর শরীরের গঠন দেখে ওই দু’জনকে উদ্দেশ্য করে দোকানীর প্রশ্ন। বাড়ি কই ? শিশুর সোঁজা উত্তর। বাড়ি দিয়া কাম কি ? পান চাইছি পান দেন।

পাশের বেঞ্চে বসা এই প্রতিবেদক। কৌতুহল বেড়ে যায়। এতো অল্প বয়সে পান চাওয়া আর ব্যবসায়ীর সাথে কথার ধরণ দেখে। তাৎক্ষণিক তার কাছ থেকে তথ্য বের করার লোভ হয়। শিশুটিকে আদরের সাথে কাছে ডাকা। অতঃপর কথোপকথন।

নাম কি তোমার ?

রবিউল আউয়াল (৮/৯)

বাহ্ সুন্দর নাম। ইসলামে তোমার নামের একটা মহাত্ব আছে জান ? 

না জানি না। 

ঠিক আছে, আপতত জানার দরকার নেই, তা বাড়ি কোথায় ? 

মোগরাপাড়, (মূহুর্তেই ভোল পাল্টে) নাহ - বাড়ি-ঘর নাই । 

কি করো ? 

চৌরাস্তা আক্তারের পানের দোকান আছেনা হেইডা (সেইটা) আমার আন্ডারে চলে। এমুন (এমন) মোট ৩টা দোকান আমার কতায় (কথায়) চলে। আমি দেহি (দেখবাল)।

তো তোমার যে বয়স আর শরীর, চৌরাস্তা কতো নেতা-ক্ষেতা আছে, তারা কিছু বলেনা। 

শিশুর সোঁজা উত্তর - আফনে (আপনি) আমরে চিনেন ? আমি “হাইওয়ে পিচ্চি কিং  ব্লেড রাজা  গ্রুপ” এর।

শিশুরটির এমন কথায় আমার (প্রতিবেদক) কৌতুহল আরো বেড়ে গেল। তার উদ্দেশ্যে আমার প্রশ্ন - কি  গ্রুপ ? 

শিশুটির আরো ভাব নিয়ে উত্তর - “হাইওয়ে পিচ্চি কিং ব্লেড রাজা  গ্রুপ”। 

আমার কৌতুহল থেকে জানতে চাই ‘হাইওয়ে পিচ্চি’ মোটামুটি বুঝলাম কিন্তু ‘কিং ব্লেড রাজা  গ্রুপ’ এটাতো বুঝলাম না। এরমানে কি ?

সাথের শিশুটির উত্তর - হেরা (তারা) ব্লেড দিয়া কাম করে। আর হাইওয়েতে অগ (ওদের)  গ্রুপের চেয়ে শক্তিশালী কেউ নাই। হের লাইগা (সে জন্য) কিং। 

তাদের প্রতি আবারো প্রশ্ন - রাজা কেন ? কিং মানেইতো রাজা।

আবারো সেই শিশু রবিউল আউয়ালের উত্তর - রাজা ভাই অইতাছে আমাগ (আমাদের) বস। কৌশলে জানতে চাই, রাজার পরিচয়।

শিশুটি জানায়, তাদের বস রাজার বাড়ি চিটাগাং রোড। শিশুটির ভাষ্যমতে, রাজা ট্রাকের হেলপার। চিটাগাং রোড এলাকায় কোন এক জনপ্রতিনিধি (চেয়ারম্যান) এর ছেলের সাথে সবসময় চলাফেরা করে। সেই রাজার আওতাধীন ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি  গ্রুপ কাজ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে। যাদের কাজই হচ্ছে হাইওয়েতে বিভিন্ন স্পটে অপরাধ মূলক কাজ করা। আর ব্লেড হচ্ছে তাদের প্রধান অস্ত্র। কারণ হিসেবে জানায়, ব্লেড ধারালো এবং সহজেই বহনযোগ্য। আবার কখানো ধরা পরলে যে কোন স্থানে ফেলে দিয়ে নিরাপদে থাকা যায়। 

সম্প্রতি মোগরাপাড়া পুরান বাজারে প্রতিবেদকের সাথে এ সকল কথা হয় শিশু রবিউলের (রবিউলের পুরো পরিচয় প্রতিবেদকের কাছে রক্ষিত)। একপর্যায় প্রতিবেদক দোকানীকে ছবি তোলার ইঙ্গিত দিলে দোকানি যখন ছবি তুলতে যায় তখন মুখ লুকায় রবিউল। 


অনেক চেষ্টা করে তার ছবি তোলা হয়। একপর্যায় রবিউলের সাথে থাকা আরিফের প্রশ্ন - ওই মিয়া ছবি তোলেন ক্যান ? আপনি কি সাংবাদিক না-কি ?

যদিও পরিচয় গোপন রাখা হয় আরো তথ্য পাওয়ার আশায়। কিন্তু আর কিছুতেই কোন কথা না বলে দ্রুত পান নিয়ে চলে যায় তারা।

এ ঘটনার পর গত কয়েকদিনে কথা হয় অনেকের সাথে। চৌরাস্তা ও মোগরাপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী, বিভিন্ন পরিবহন চালক ও তাদের সহযোগিসহ সাধারণ পথচারীদের। খোঁজ নিয়ে জানাযায়, প্রায় প্রতিদিনই চৌরাস্তা বাসস্ট্যান্ড, পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে থাকা ইউটার্ণ এলাকা এবং মোগরাপাড়ার উপর দিয়ে যাওয়া গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের প্রয়াত মোশারফ চেয়ারম্যানের বাগান বাড়ি বা মধুবাগ এলাকা, চৌরাস্তা বনবিভাগ, ছোট সাদিপুরে মাদ্রাসার সামনে ঘটে ছিনতাইয়ের এসব ঘটনা। 

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো “হাইওয়ে পিচ্চি কিং ব্লেড রাজা  গ্রুপ” এর সদস্যরা বেশিরভাগই সন্ধ্যার পর টোকাইয়ের বেশে সাথে বস্তা নিয়ে বিভিন্ন স্পটের আশে-পাশে থাকে। 

এ সকল এলাকায় গত ১০ দিনের মধ্যে ঘটেছে ৫টি ছিনতাই, ৩টি মিশুক ও একটি অটো রিক্সা চুরির ঘটনা। ভুক্তভোগীদের দাবি - যেদিন দোকানপাট দ্রুত বন্ধ হয়ে যায় এবং সড়কে লোকজনের পদচারণা কম থাকে, তখনই বেড়ে যায় ছিনতাইকারীদের দৌড়াত্ম্য। তবে তাদের দাবি, দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য খোলা থাকলে সড়কে ও বিভিন্ন মহল্লায় লোকজন থাকে। ফলে কোন দুর্ঘটনা ঘটলেও চিৎকার করলে মানুষজন আসলে ক্ষতির পরিমাণও হয় কম।

আর এসকল অপকর্মগুলো করে থাকে “হাইওয়ে পিচ্চি কিং  ব্লেড রাজা গ্রুপ” এর মতো নিরবে গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন গ্রুপের সদস্যরা। 

এ ব্যাপারে সোনারগাঁও থানা অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান ‘সোনারগাঁও দর্পণ’কে জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে রাতে বিভিন্ন স্পটকে লক্ষ্য করে ১০টা মোবাইল টিম কাজ করে। আমি এখানে জয়েন্ট করার পর মহাসড়কে নিরাপত্তার বিষয়টি অতিগুরুত্বের সাথে দেখছি। বর্তমানে অপকর্ম আগের চেয়ে অনেক কম। নেই বললেই চলে। তবে, “হাইওয়ে পিচ্চি কিং ব্লেড রাজা  গ্রুপ” এই নাম এরআগে শুনিনি। এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে অবশ্যই ব্যবস্থা নিব।

‘সোনারগাঁও দর্পণ’ও মনে করে মহাসড়কে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ড সংগঠনকারী প্রতিষ্ঠিত এবং উদীয়মান গ্রুপের সদস্যদের শনাক্ত করতে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্সদের আরও বেশি তৎপরতা দেখাতে হবে। এখনই তাদের শনাক্ত করতে না পারলে সোনারগাঁওবাসীদের কপালে ভবিষ্যতে অনেক বেশি দুর্ভোগে পরতে হবে। এরা ছিনতাইকারী, এরা ভয়ঙ্কর; এদের অঙ্কুরে বিনাশ করুন।


Post a Comment

[blogger]

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget